ভোরের জানালা

জনগণের কল্যাণে অগ্রদূত

রাজবাড়ীতে উদয়পুর হাফিজিয়া কওমী মাদরাসা বন্ধ করে দেয়াসহ দুর্নীতির অভিযোগ! (পর্ব-১)

1 min read

বিশেষ প্রতিনিধি :

বাংলাদেশে সুনাম অর্জনকারী ইসলামীক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মঝে কওমী মাদরাসাগুলো এখনো প্রথম স্থান দখল করে রয়েছে। তেমনি একটি হাফিজিয়া কওমী মাদরাসা এবং এতিমখানা রয়েছে রাজবাড়ী সদর উপজেলা বসন্তপুর ইউপির উদয়পুর গ্রামে। মাদরাসাটির নাম উদয়পুর হাফিজিয়া কওমী মাদরাসা।

২০১৬ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এতিম শিক্ষার্থীদের লেখাপড়াসহ ওই মাদরাসার উন্নয়নের স্বার্থে সভাপতির দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন মোঃ রাজু মোল্লা এবং সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছিলেন মোঃ শহীদ শেখ। চলতি বছরের জুন মাসে মৌখিকভাবে পুরনো কমিটি ভেঙ্গে নতুন কমিটি গঠন করলেও নতুন কমিটির নিকট কোনো আয় ব্যয়ের হিসাব, কিংবা নগদ অর্থের হিসাব ও ডোনারদের তালিকা বুঝিয়ে না দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে সাবেক কমিটির সভাপতি মোঃ রাজু মোল্লার বিরুদ্ধে। এছাড়া নিজের প্রভাব বিস্তার করে মাদরাসার প্রধান ফটকে তালা মেরে ওই মাদরাসা বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় লোকজন, মাদরাসার বর্তমান কমিটির সদস্য এবং মাদরাসার একাধিক শিক্ষক জানান- ২০১৬ সালে এলাকাবাসীর মাধ্যমে নির্বাচিত হয়ে সভাপতির দায়িত্ব নেয় রাজু মোল্লা। প্রথম দিকে মাদরাসার উন্নয়নে কাজ করে গেলেও যখন বিভিন্ন দাতা সংস্থা আর মাদরাসার ফান্ডের প্রতি নজর পরে তখনই লোভ আর অজ্ঞাত ক্ষমতার বলে নড়ে-চড়ে বসেন তিনি। তবে গত জুন মাসে এলাকাবাসীর চাপা ক্ষোভের মুখে মৌখিক ভাবে সভাপতির পদ ছেড়ে দিতে হলেও নতুন কমিটির হাতে কোনো দায়িত্ব বুঝিয়ে দেয়নি রাজু মোল্লা। এ যেন হাত-পা বেঁধে নদীতে সাঁতার কাটতে দেওয়ার মতো অবস্থা। ফলে নদীতে নেমেই হাবুডাবু খাচ্ছে নতুন কমিটি।

এদিকে মাদরাসার সাবেক সভাপতি রাজু মোল্লা বলেন, ২০১৬ থেকে আমরা কমিটির দায়িত্ব পালন করলেও গত জুন মাসে ঈদ-উল-আযহা ২০২৪ এর আগ মুহুর্তে নতুন কমিটি গঠন করে পুরনো কমিটি ভেঙ্গে দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ওই মাদরাসার সভাপতি মোঃ আরশাদ চৌধুরী এবং সাধারণ সম্পাদক মোঃ আল-আমিন। যদিও নতুন কমিটি গঠন হয়েছে, কাগজে কলমে এখনো আমরাই বহাল রয়েছি। তাই আয় ব্যয়ের হিসাব, ব্যাংক একাউন্ট সহ সব কিছু আমাদের আয়ত্ত্বে রয়েছে।

সাবেক সভাপতির এই রহস্যময় কথার উত্তর খুঁজতে গিয়ে বেরিয়ে আসে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য। আর এসব তথ্যগুলোর উপর ভিত্তি করে অনুসন্ধান চালিয়ে ধারাবাহিক ভাবে প্রতিবেদন প্রকাশ করবে “ভোরের জানালা”।

রাজু মোল্লার তথ্য মতে গেলো ঈদুল আযহা’র আগ পর্যন্ত মাদরাসার মোট শিক্ষার্থী ছিলো ৩৫-৪০ জন। তবে সরেজমিনে জানাযায়, মাদরাসার খাতায় কলমে নাম রয়েছে ৩১ জন শিক্ষার্থীর। এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত মাদরাসার প্রকৃত শিক্ষার্থী কতো এবং ক’জন এতিম শিক্ষার্থী এ মাদরাসায় লেখাপড়া করছে তার সঠিক সংখ্যা জানা সম্ভব হয়নি।

এতিম শিক্ষার্থীদের জন্য কুয়েতি দাতা সংস্থা থেকে মাথাপিছু ১৩৫০ টাকা করে সহায়তা, জুম’আ নামাজ শেষে মসজিদ থেকে কালেকশন, কোলার হাট থেকে এতিমদের নামে কালেকশন, বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে কালেকশনই মাদরাসার প্রধান আয়ের উৎস। তবে, বিভিন্ন কালেকশন আর কুয়েতি দাতা সংস্থার পক্ষ থেকে ১৩৫০ টাকা এতিম শিক্ষার্থীদের জনপ্রতি আর্থিক সহায়তা থাকার ফলেও প্রতিটি শিক্ষার্থীর কাছ থেকে মাস শেষে ১৫০০ টাকা করে খোরাকি খচর নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে মাদরাসার তৎকালীন সভাপতি রাজু মোল্লার বিরুদ্ধে। এদিকে বর্তমানে মাদরাসাটি বন্ধ থাকলেও কুয়েতি দাতা সংস্থার ডোনেশন নিয়মিত চলমান আছে বলেও তথ্য মিলেছে।

স্থানীয় গাবলা গ্রামের বিল্লাল শেখ অভিযোগ করে বলেন, আমি একজন এতিমকে দায়িত্ব নিয়ে উদয়পুর হাফিজিয়া কওমী মাদরাসায় ভর্তি করানোর পর লেখাপড়ায় সহায়তার জন্য কিছুদিন সামান্য আর্থিক সাহায্য পেয়েছিলো ছেলেটি। এরপর থেকে আজ পর্যন্ত তাকে কোনো আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়নি। এছাড়া এতিম শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দকৃত কুয়েতি দাতা সংস্থা থেকে গত দুই বছর আগে দুই থেকে তিনজন শিক্ষার্থীকে শুধু মাত্র ৪ মাস করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন এতিম ছাত্রদের অভিভাবকেরা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক অভিভাবক বলেন, আমার ছেলের নামে বরাদ্দকৃত কুয়েতি সংস্থার টাকা চাইতে গেলে সভাপতি রাজু মোল্লা আমার সাথে দূর ব্যবহারসহ আমার গায়ে হাত তুলেন। শুনেছি মাদরাসার এতিম ছাত্রদের নামে এখনো কুয়েতি সংস্থার টাকা আসে। কিন্তু মাদরাসার সভাপতি রাজু মোল্লা শুধু প্রথম ৪ মাসই দিয়েছেন। তাও ২-৩জন শিক্ষার্থীকে। এ মাদরাসায় শিক্ষার্থীদের মাসিক বেতন দিয়ে তারপর সেখানে পড়তে হয় বলেও একাধিক অভিভাবক অভিযোগ করেছেন।

শুধু মাত্র ৪ মাস দাতা সংস্থার আর্থিক সহায়তা শিক্ষার্থীদের দেওয়া হয়েছে বলে স্বীকার করলেও কতোজন শিক্ষার্থীকে তা দেওয়া হয়েছে এবং বর্তমানে কেন তাদের সেই আর্থিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে না এমন প্রশ্নের কোনো সদোত্তর দিতে পারেনি সাবেক সভাপতি মোঃ রাজু মোল্লা। মাদরাসার সাবেক সভাপতি রাজু মোল্লা বিভিন্ন দাতা সংস্থাসহ মাদরাসা ফান্ডের বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর।

এছাড়া মাদরাসার নামে কালেকশন আর বিভিন্ন সংস্থার সহায়তা অর্থ কি কি খ্যাতে ব্যয় করা হয় এবং তা কোথায় জমা রাখা হয় জানতে চাইলে রাজু মোল্লা বলেন, ব্যাংক এশিয়ায় প্রতিষ্ঠানের নামে একাউন্ট করা আছে, সেই একাউন্টের মধ্যেই এতিমদের অর্থ রাখা হয়। ব্যাংকের আয়-ব্যয় এর স্টেটমেন্ট দেখতে চাইলে পরে দেখানোর কথা বললেও এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত তিনি প্রতিবেদককে তা দেখাতে পারেনি।

এদিকে মাদরাসার শিক্ষার্থীদের অভিভাবক ও উদয়পুরসহ বসন্তপুর ইউনিয়নবাসী ‘উদায়পুর হাফিজিয়া কওমী মাদরাসা’র সাবেক সভাপতি কর্তৃত আত্মসাৎকৃত এতিমদের অর্থ ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য প্রতিবেদকের মাধ্যমে রাজবাড়ী সদর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা এসএম নওয়াব আলী ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে আহ্বান জানান।

(চলবে …)

‘রাজবাড়ীতে উদয়পুর হাফিজিয়া কওমী মাদরাসা বন্ধ করে দেয়াসহ দুর্নীতির অভিযোগ!’ শিরোনামে প্রথম পর্ব প্রচারের পর দ্বিতীয় পর্বের অনুসন্ধান সম্পন্ন করেছেন আমাদের প্রতিবেদক।
“রাজবাড়ীতে অজ্ঞাত ক্ষমতায় দাপুটে বিএনপি নেতা; এতিমদের অর্থ আত্মসাৎ করে নিজ মাদরাসা প্রতিষ্ঠা!” শিরোনামে দ্বিতীয় পর্বটি পড়তে চোখ রাখুন ভোরের জানালা’য়।

{বিঃদ্রঃ যেহেতু প্রতিবেদনটি ধারাবাহিক ভাবে অনুসন্ধানের মাধ্যমে নতুন নতুন তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে, সেক্ষেত্রে সংবাদের অনলাইন ভার্সনের তথ্য সংযোজন-বিয়োজন করা হতে পারে}

Please follow and like us:
স্বত্ব © ২০২৪ ভোরের জানালা | Newsphere by AF themes.
Translate »