ভোরের জানালা

জনগণের কল্যাণে অগ্রদূত

আর্থিক খাতের অপরাধ নিয়ে আংশিক রিপোর্টের ‘টেইলর’ ভাসে

1 min read

সাঈদুর রহমান রিমন, সিনিয়র অনুসন্ধানী সাংবাদিক

সাঈদুর রহমান রিমনঃ

‌‘আংশিক নয় পুরো সত্য’ স্লোগান দিয়েই একটি পত্রিকা দেশবাসীর দৃষ্টি কেড়েছিল, পত্রিকাটি নিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল পাঠক সমাজ। পাঠকরা বুঝিয়ে দিয়েছিল পুরো ঘটনা জানতেই তারা বেশি আগ্রহী। কিন্তু দেশে সাংবাদিকদের অনুসন্ধান নির্দিষ্ট বলয়ের মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছে-তা আর পরিপূর্ণ রিপোর্টের আদল পাচ্ছে না। যেমন এক বেনজীর আর মতিউর কাণ্ড নিয়ে যেভাবে সাংবাদিকরা একের পর এক ফলোআপ রিপোর্ট করে চলছেন সেভাবে কী অন্যদের নিয়ে ফলোআপ হচ্ছে?

সাবেক ডিএমপি কমিশনার আসাদুজ্জামান মিঞা, বরিশালের ডিআইজি জামিল হাসান, বিদেশে কর্মী পাঠানোর নামে যে ৪ এমপির প্রতিষ্ঠান ২৪ হাজার কোটি টাকা লুটে নিয়েছেন তাদের নিয়ে কি কোথাও কোনো ফলোআপ রিপোর্ট হচ্ছে?বাংলাদেশ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের কোটি কোটি টাকা লুটপাট, সাভার উপজেলা চেয়ারম্যান রাজিবের কয়েক হাজার কোটি টাকার মালিক বনে যাওয়া, মন্ত্রীর পার্টনার, খাগড়াছড়ির বাদাম বিক্রেতা অমলের বিত্ত বৈভব নিয়ে আর কি কেউ এক লাইনও লিখেছেন? ময়মনসিংহের সব থানার ওসির স্ত্রীরা শত ক্রোড়পতি, ইউরোপ আমেরিকায় তাদের বাড়ি গাড়ি। সে ব্যাপারেও কোনো সাংবাদিক দুই লাইন ফলোআপ দেয়ার চেষ্টা করেছেন? তাহলে কী দাঁড়াল?

দাঁড়ালো, আংশিক খবর জানিয়ে পাঠক সমাজকে কাতুকুতু দিয়েই রিপোর্টাররা আত্মতৃপ্তিতে ঘুমিয়ে পড়ছেন?

চব্বিশটি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে গ্যাড়াকলে ফেলে সাদ মুসা গ্রুপ সাড়ে পাঁচ সহস্রাধিক কোটি টাকা ঋণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাচার করে দিয়েছে। এর আগে স্বাস্থ্য খাতের মাফিয়া মিঠু লুটপাট করেছে আট হাজার কোটি টাকারও বেশি। তিনিও সব টাকা যুক্তরাষ্ট্রে পাচার করে সেখানে ব্যবসা বাণিজ্য গড়ে তুুলেছেন। দেশের শত্রু পিকে সাহাও হাতিয়ে নিয়েছেন সাড়ে দশ হাজার কোটি টাকা-সেগুলোও পাচার হয়েছে দেশের বাইরে। অথচ টাকা পাচারের আগে কিংবা পাচারের পক্রিয়া চলাকালেও সে খবর দেশবাসী জানতে পারে না কেন? আসলে তাদের জানতে দেওয়া হয় না। অভিযোগ রয়েছে, টাকা নিয়ে পাচারকারীরা নিরাপদে দেশ ত্যাগের পরই সে খবর রটানোর মাধ্যমে অভিযুক্ত কর্তারা বাঁচার পথ করে নেয়। সেই অপকর্মের ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে প্রকাশিত খবরা খবর কেবলই সহযোগীর ভূমিকা পালন করে থাকে।

পাঠক হিসেবে আমাদের অর্থ খাত কেন্দ্রিক দুর্নীতি, লুটপাট, অপরাধ সংক্রান্ত রিপোর্টের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুললে তাতে কারোর ক্ষোভের কারণ দেখি না।

ফারমার্স ব্যাংক-পদ্মা ব্যাংক কেন্দ্রিক লুটপাট পরিস্থিতি, ইউনিপেটুইউ, যুবক, বেসিক ব্যাংক, হলমার্ক কেলেঙ্কারী, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ লুটের সর্বশেষ তথ্য কি সংশ্লিষ্ট রিপোর্টাররা দেশবাসীকে জানাতে পারছেন? অর্ধ শতাধিক এমএলএম কোম্পানি চার কোটি মানুষের সর্বনাশ ঘটিয়ে দুই লক্ষাধিক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। নিউজ ছাপিয়ে একেকটি হায় হায় কোম্পানি বন্ধ করা গেছে – কিন্তু সর্বস্বহারা মানুষজন কি ১০/১২ বছরে একটি টাকাও ফেরত পেলেন? পাননি। জনস্বার্থ বিষয়ক সেসব রিপোর্টের ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতার নজীর আছে কি? কেন নেই? বেনজীর-মতিউর কাণ্ডের চেয়ে সেগুলো কি কম গুরুত্বের?

আমি তো মনে করি দৈনিক পত্রিকায় বেশুমার লুটপাট ও টাকা পাচার সংক্রান্ত বিষয়গুলো নিয়ে স্থায়ী একটা কর্ণার বানিয়ে প্রতিদিনই আপডেট জানানো উচিত। যেমন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ লুটের আজ ৬৫৬ তম দিবস- এখনও ফিরিয়ে আনা যায়নি সাড়ে সাত হাজার কোটি টাকা’, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ লুটের আজ ৬৫৭ তম দিবস- তদন্তকারী কর্মকর্তা অন্য কাজে ব্যস্ত’ ইত্যাদি।

আমাদের দেশে অর্থনৈতিক বিষয়ক সাংবাদিকতায় কোনো অনুসন্ধানই চুড়ান্ত কোনো রুপ পায় না। জনসাধারণকে মুভির টেইলর দেখানোর মতো একঝলক ঘোষণা দিয়েই হারিয়ে যায়। হয়তো সাংবাদিককে হারিয়ে যেতে বাধ্য করা হয় কিংবা সাংবাদিক নিজেই তৃপ্তিবোধে অচেতন হয়ে পড়েন। তাছাড়া আর্থিক খাতের লুটেরা চক্র মাত্রাতিরিক্ত প্রভাবশালী হওয়ায় তারা গণমাধ্যমের মালিকপক্ষকেই বশ করে ফেলেন। হোক তা দাপট দেখিয়ে, না হয়তো সুবিধা দিয়ে।

জাহিদুজ্জামান ফারুক ভাইদের গড়ে তোলা আধুনিক অর্থ বাণিজ্য ব্যাংকিং সাংবাদিকতাকে শওগাত আলী সাগর ভাইয়েরা অনেক দূর এগিয়ে নিয়েছিলেন। এখন শুনি, রাজনৈতিক দালাল নেতারা অর্থনীতি বিষয়ক পত্রিকার মালিক সম্পাদক, তার ভক্ত সমর্থকরাই লিখে আর্থিক খাতের রিপোর্ট। কিন্তু জানা উচিত যে, অর্থনৈতিক, আইন, জ্বালানি বিট হচ্ছে বিশেষায়িত রিপোর্টিং বিট। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পড়াশুনা ছাড়া, নির্দ্দিষ্ট দক্ষতা ব্যতিত এসব বিটের রিপোর্টার হওয়ার সুযোগ নেই।

অর্থনৈতিক বিষয়ক রিপোর্টারকে অর্থ, বাণিজ্য, ব্যাংকিং খাতের সবকিছু টু দ্যা পয়েন্টে জানতে বুঝতে সক্ষম থাকতে হয়। একমাত্র অর্থ বিটের সাংবাদিকদেরই আগাম শঙ্কা কিংবা সম্ভাবনা বুঝার মতো মেধা জ্ঞ্যান সম্পন্ন হতে হয়। সেখানে রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মিরা অর্থনৈতিক বিষয়ক রিপোর্টার হলে আর্থিক খাতে নিত্য নতুন চাদাবাজির স্টাইল ছাড়া আর কিইবা আবিস্কার করতে পারবেন? যদিও মানসম্পন্ন গণমাধ্যমের জানাশোনা মেধাবী সাংবাদিকেরাও যে আহামরি কোনো অবদান রাখছেন তা বলছি না।

আজ পর্যন্ত বিদেশে টাকা পাচারের মেশিন ও পাইপ লাইনগুলো কি সাংবাদিকরা চিহ্নিত করে দিতে পেরেছেন? পেরেছেন কি তা বন্ধের পরামর্শ তুলে ধরতে? বড় অঙ্কের টাকা পাচারের হুন্ডি ব্যবস্থাপনাকারী হাতে গোণা কয়েকজন- তাদের মুখোশ উন্মোচণের সাহস কি একজন সাংবাদিকও রাখেন না? অথচ বাংলাদেশ থেকে লাখ কোটি টাকা পাচার নিয়ে অনুসন্ধানী রিপোর্ট করে ভারতীয় মিডিয়ায়, যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদ মাধ্যমে। এসব দেখেও কি বাংলাদেশী রিপোর্টারদের মধ্যে অনুশোচনা বোধ হয় না?

(আমার এ লেখনিকে কেবলই একজন পাঠকের খোলামত হিসেবে বিবেচনায় নিলে খুশি হবো। কারণ, আমি নিজেও তো বিশেষায়িত অর্থবিটের দক্ষ কোনো সাংবাদিক নই।)

Please follow and like us:
স্বত্ব © ২০২৪ ভোরের জানালা | Newsphere by AF themes.
Translate »