ঢাকসু থেকে শুরু করে রাকসু, চাকসু, জাকসু এবং সর্বশেষ জকসু—একটির পর একটি ছাত্র সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল মনোনীত প্রার্থীদের ভরাডুবি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি কেবল কয়েকটি নির্বাচনী পরাজয়ের হিসাবও নয়। বরং এটি ক্যাম্পাস রাজনীতির গভীরে জমে থাকা একটি দীর্ঘ সংকটের বহিঃপ্রকাশ। যেখানে সময়, সংগঠন, রাজনৈতিক ভাষা ও শিক্ষার্থীদের মানসিকতার সঙ্গে তাল মিলাতে ব্যর্থ হওয়ার মাশুল গুনতে হচ্ছে ছাত্রদলকে। এই পরাজয়কে যদি শুধুই ‘নির্বাচনী কারচুপি’, ‘প্রশাসনিক পক্ষপাত’ কিংবা ‘রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন’-এর একমাত্র ফল বলে ব্যাখ্যা করা হয়, তবে বাস্তবতাকে অস্বীকার করা হবে। কারণ প্রতিকূলতার মধ্যেও ইতিহাসে বহুবার ছাত্রদল জনসমর্থন আদায় করেছে। আজ যে ব্যর্থতা, তা মূলত নিজেদের ভেতরের প্রশ্নগুলোর উত্তর না খোঁজার ফল।
এই বাস্তবতা আরও বেশি প্রশ্নের জন্ম দেয় তখনই, যখন দেখা যায় আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিভিন্ন জনমত জরিপে বিএনপির সরকার গঠনের সম্ভাবনা প্রবল বলে আলোচিত হচ্ছে। রাষ্ট্রক্ষমতার প্রশ্নে যেখানে বিএনপি জনসমর্থনের পাল্লায় এগিয়ে, সেখানে একই দলের ছাত্রসংগঠন ছাত্রদল কেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীদের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে—এই দ্বৈত বাস্তবতা গভীর আত্মসমালোচনার দাবি রাখে।
প্রথম যে বাস্তবতা সামনে আসে, তা হলো দীর্ঘদিন ক্যাম্পাস থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন থাকা। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশের অধিকাংশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়নি। এই সময়টায় ছাত্র রাজনীতির মাঠে যারা নিয়মিত ছিল, তারা নিজেদের মতো করে নেটওয়ার্ক, সম্পর্ক ও প্রভাব তৈরি করেছে। অন্যদিকে ছাত্রদল ছিল কখনো দমন-পীড়নের শিকার, কখনো আত্মরক্ষামূলক রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ, আবার কখনো নিষ্ক্রিয়। এর ফলে একটি সম্পূর্ণ প্রজন্ম ছাত্রদলকে দেখেনি কর্মসূচির মাধ্যমে, দেখেনি আবাসিক হলের দৈনন্দিন সমস্যায় পাশে দাঁড়াতে, দেখেনি শিক্ষার্থীদের প্রশাসনিক জটিলতা মোকাবিলায় ভূমিকা রাখতে। তারা ছাত্রদলকে চিনেছে মূলত অতীতের গল্পে, কিংবা জাতীয় রাজনীতির ভাষ্যে। ভোটের দিনে সেই দূরত্বটাই সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সাংগঠনিক দুর্বলতা। ছাত্র সংসদ নির্বাচন কেবল রাজনৈতিক বক্তব্যের লড়াই নয়; এটি ব্যবস্থাপনার, পরিকল্পনার এবং মাঠপর্যায়ের সংগঠনের পরীক্ষার লড়াই। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, ছাত্রদলের প্যানেল ঘোষণায় দেরি হয়েছে, প্রার্থীদের মধ্যে সমন্বয় ছিল না, নির্বাচনী ইশতেহার ছিল অস্পষ্ট কিংবা সাধারণ শিক্ষার্থীর ভাষায় পৌঁছাতে ব্যর্থ। কোথাও কোথাও যোগ্যতা ও গ্রহণযোগ্যতার চেয়ে আনুগত্যই প্রার্থী বাছাইয়ের প্রধান মানদণ্ড হয়েছে। এতে করে সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে প্রার্থীরা হয়ে উঠেছেন ‘দলীয় মুখ’, ‘ক্যাম্পাসের প্রতিনিধি’ নয়। ছাত্র সংসদ যেখানে শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন চাহিদা, সুযোগ-সুবিধা ও অধিকার নিয়ে কথা বলার মঞ্চ, সেখানে দলীয় ভাষা ও এজেন্ডা বাস্তবায়নের প্রবণতা স্বাভাবিকভাবেই ভোটারদের বিমুখ করেছে।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো রাজনৈতিক ভাষা ও বার্তার পুরোনো কাঠামো। ছাত্রদল দীর্ঘদিন ধরে যে ভাষায় রাজনীতি করে এসেছে, তার বড় অংশ জুড়ে রয়েছে জাতীয় রাজনীতির সংকট, রাষ্ট্রীয় দমন, গণতন্ত্র ও আন্দোলনের বয়ান। এগুলো গুরুত্বহীন নয়, বরং ঐতিহাসিকভাবে ছাত্রদলের পরিচয়ের সঙ্গেই যুক্ত। কিন্তু বর্তমান ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীরা একই সঙ্গে চাকরির অনিশ্চয়তা, গবেষণার সুযোগ, আবাসন সংকট, পরিবহন সমস্যা, মানসিক স্বাস্থ্যের চাপ এবং প্রযুক্তিনির্ভর ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন। তারা ছাত্র সংসদ থেকে শুনতে চায় লাইব্রেরি কীভাবে উন্নত হবে, হলে সিট সংকট কীভাবে কমবে, সেশনজট কীভাবে নিরসন হবে, যৌন হয়রানি বা নিরাপত্তাহীনতা মোকাবিলায় কী উদ্যোগ নেওয়া হবে। এই বাস্তব প্রশ্নগুলোর স্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য উত্তর ছাত্রদল দিতে পারেনি, বা দিলেও তা পৌঁছায়নি সাধারণ শিক্ষার্থীর কাছে। ফলে সাধারণ শিক্ষার্থীরা ছাত্রদলকে জাতীয় রাজনীতির প্রতিনিধি হিসেবে দেখলেও নিজেদের সমস্যা সমাধানের কার্যকর মাধ্যম হিসেবে ভাবেনি।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভাবমূর্তির সংকট। নব্বইয়ের দশক কিংবা তার আগের সময়ের ছাত্রদল ছিল আন্দোলন, ত্যাগ ও সাহসের প্রতীক। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই ভাবমূর্তি ক্ষয় হয়েছে নানা বাস্তব ও কাল্পনিক অভিযোগে। নতুন প্রজন্ম ইতিহাস শুনতে চায় না, তারা বর্তমান দেখতে চায়। অতীতের সহিংস রাজনীতি, হল দখল কিংবা অভ্যন্তরীণ কোন্দলের স্মৃতি ছাত্রদলের ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। দীর্ঘদিন ক্যাম্পাসে সক্রিয় না থাকায় এই নেতিবাচক ধারণা ভাঙার সুযোগও তারা পায়নি। ফলে ভোটের সময় শিক্ষার্থীরা ঝুঁকি নিতে চায়নি। নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের চোখে ছাত্রদল হয়ে উঠেছে একটি ‘পুরোনো ধারার সংগঠন’, যাদের সঙ্গে বর্তমান ক্যাম্পাস জীবনের সরাসরি সংযোগ কম।
প্রতিদ্বন্দ্বীদের কৌশলও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। যেসব সংগঠন সাম্প্রতিক নির্বাচনে ভালো ফল করেছে, তারা দীর্ঘদিন ধরে নীরবে কিন্তু ধারাবাহিকভাবে কাজ করেছে। তারা ব্যক্তিগত যোগাযোগ, সামাজিক কাজ, শিক্ষার্থীদের ছোট ছোট সমস্যায় পাশে দাঁড়ানো, এমনকি আধুনিক প্রচারণা কৌশল ব্যবহার করে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়েছে। ছাত্রদল অনেক ক্ষেত্রেই নির্বাচনের ঠিক আগে সক্রিয় হয়েছে, যা শিক্ষার্থীদের কাছে হঠাৎ আগ্রহ বা কৌশলগত উপস্থিতি বলে মনে হয়েছে। রাজনীতিতে বিশ্বাস রাতারাতি তৈরি হয় না; এটি গড়ে ওঠে সময়ের সঙ্গে, ধারাবাহিক উপস্থিতির মাধ্যমে।
অনেক বিশ্লেষকের মতে কেন্দ্রীয় রাজনীতির নির্দেশনা ও ক্যাম্পাস বাস্তবতার মধ্যে সমন্বয়হীনতা ছাত্রদলকে দুর্বল করেছে। কেন্দ্র থেকে যে রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা আসে, তা সব সময় ক্যাম্পাসের বাস্তব সমস্যার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় না। সেসব ক্ষেত্রে স্থানীয় নেতৃত্ব দ্বিধায় পড়ে যায়—তারা কি জাতীয় রাজনীতির স্লোগান তুলবে, নাকি ক্যাম্পাস সমস্যার কথা বলবে। এই দ্বিধা সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিকট ক্যাম্পাসের নেতৃত্বের অবস্থান অস্পষ্ট করে তোলে। শিক্ষার্থীরা স্পষ্টতা চায়; তারা জানতে চায় ছাত্র সংসদে নির্বাচিত হলে প্রার্থীরা কী করবেন, কীভাবে করবেন।
এ ছাড়া নির্বাচনকে ঘিরে বাস্তব প্রতিবন্ধকতাও ছিল, যা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। প্রশাসনিক পক্ষপাত, ক্ষমতাসীনদের প্রভাব, অসম মাঠ—এসব ছাত্র রাজনীতির বাস্তবতা। কিন্তু একই বাস্তবতায় অন্য সংগঠন যখন সীমিত সাফল্য অর্জন করতে পারে, তখন ছাত্রদলের প্রশ্ন হওয়া উচিত—তারা কোথায় পিছিয়ে পড়ল? শুধুমাত্র প্রতিকূলতার কথা বলে আত্মসমালোচনা এড়িয়ে গেলে ভবিষ্যতের পথ তৈরি হয় না।
সবশেষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি সামনে আসে, তা হলো শিক্ষার্থীদের মানসিক পরিবর্তন। আজকের শিক্ষার্থী আগের মতো শুধুই আদর্শিক লড়াইয়ের ভাষায় উদ্বুদ্ধ হয় না। তারা বাস্তববাদী, প্রশ্নপ্রবণ এবং ফলাফলমুখী। তারা দেখতে চায় কে কী করবে, কীভাবে করবে এবং কেন বিশ্বাস করা যায়। ছাত্রদলের রাজনীতিতে যদি এই বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন না ঘটে, তবে শুধু ঐতিহ্য, ইতিহাস বা জাতীয় রাজনীতির সম্ভাবনা দিয়ে ক্যাম্পাসে জয়ী হওয়া সম্ভব নয়।
এই পরাজয় তাই শেষ কথা নয়, বরং একটি সতর্ক সংকেত। ছাত্রদল যদি সত্যিই ক্যাম্পাস রাজনীতিতে ফিরতে চায়, তবে তাকে নতুন করে নিজেদের সংজ্ঞা নির্ধারণ করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি ক্যাম্পাস উপস্থিতি, শিক্ষার্থীদের বাস্তব সমস্যায় ধারাবাহিক ভূমিকা, আধুনিক ও প্রাঞ্জল রাজনৈতিক ভাষা, স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব নির্বাচন এবং অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া—এসব ছাড়া ঘুরে দাঁড়ানোর কোনো পথ নেই। ছাত্র রাজনীতি এখন আর কেবল স্লোগানের মাঠ নয়; এটি বিশ্বাস, দক্ষতা ও উপস্থিতির রাজনীতি। এই বাস্তবতা যত দ্রুত ছাত্রদল বুঝবে, তত দ্রুতই তারা ক্যাম্পাসে নিজেদের হারানো জায়গা ফিরে পাওয়ার সুযোগ পাবে।
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়তো বিএনপির জন্য নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিতে পারে। কিন্তু ক্যাম্পাস রাজনীতিতে ছাত্রদলের এই ধারাবাহিক ব্যর্থতা যদি অব্যাহত থাকে, তবে তা ভবিষ্যতের জন্য একটি বড় শূন্যতা তৈরি করবে। ছাত্র রাজনীতি সব সময়ই জাতীয় রাজনীতির নেতৃত্ব তৈরির কারখানা। সেই কারখানায় যদি ছাত্রদল নিজেদের অবস্থান পুনর্গঠন করতে না পারে, তবে জাতীয় রাজনীতির সম্ভাব্য সাফল্যও দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
লেখকঃ ডাঃ এ কে এম মাজহারুল ইসলাম খান কবি ও প্রাবন্ধিক